ভাষার মাসে রেডিও-টিভিতে বিকৃত বাংলা উচ্চারণে হাইকোর্টের নির্দেশনা ও দুটি কথা

ভাষার মাসে রেডিও-টিভিতে বিকৃত বাংলা উচ্চারণে হাইকোর্টের নির্দেশনা ও দুটি কথা

সিরাজ প্রামাণিকঃ

মাতৃভাষা বাংলার অবক্ষয় রোধে টেলিভিশন ও রেডিওতে ‘বিকৃত বাংলা উচ্চারণে’ অনুষ্ঠান সম্প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ‘ভাষা দূষণ’ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ও এ বিষয়ে বাংলা একাডেমীর সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করতেও সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইতোপূবেও এই বাংলাদেশে বিচার বিভাগসহ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন তৈরী হয়েছে। কিন্তু আজও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে হয়নি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী ‘প্রজাতন্ত্রে রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। সংবিধানের এ বিধান সঠিকভাবে পালিত হচ্ছে না দেখে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭ (১৯৮৭ সালের ২ নম্বর আইন) প্রণয়ন করা হয়।

১৯৮৭ সালের আইনের ৩(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারী অফিস-আদালত, আধা-সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সাথে যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন আদালতের সওয়াল জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলী অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হইবে। এই ধারা মোতাবেক কোন কর্মস্থলে যদি কোন ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় আবেদন বা আপীল করেন তাহা হইলে উহা বেআইনি ও অকার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে।’ সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আদালত’ অর্থ সুপ্রিম কোর্টসহ যেকোনো আদালত। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩ এবং উল্লিখিত আইনের অধীন আদালতসহ প্রজাতন্ত্রের সব কার্যক্রম ও রাষ্ট্রীয় নথিপত্র বাংলা ভাষায়ই বাধ্যতামূলকভাবে সম্পাদিত হওয়ার কথা। প্রসঙ্গত, দেশে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন’ করা হলেও তা বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

অবশেষে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত বৃহস্পতিবার ‘মাতৃভাষা বাংলার বিকৃত উচ্চারণ’ নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত নিবন্ধ আমলে নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত এ আদেশ দেন। আদালত বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলায় প্রদত্ত আদেশে বলেছেন, ‘বাংলা ভাষার পবিত্রতা রক্ষা করতে সর্বতোভাবে চেষ্টা করতে হবে। সেইসাথে ভাষার প্রতি আর কোনো আঘাত যাতে না আসে সে বিষয়ে সচেষ্ট হতে হবে।’ আদালত আদেশের পর্যবেক্ষণে বাংলা ভাষার পূর্ব ইতিহাস ও দেশ-বিদেশে এর প্রচলনের প্রেক্ষাপট গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তুলে ধরেন।

পরে আদালত ‘ভাষা দূষণ’ এবং ‘বিকৃত উচ্চরণে বাংলা ভাষায়’ অনুষ্ঠান প্রচারের সঙ্গে জড়িত সরকারি এবং বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিওর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে রুল জারি করেন। রুলে ‘বিকৃত বাংলা উচ্চরণে’ অনুষ্ঠান প্রচার ও ‘বাংলা ভাষা দূষণ’ রোধ এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়েছেন। এ ছাড়া টেলিভিশন ও রেডিওতে ‘বিকৃত বাংলা উচ্চরণ এবং ভাষা দূষণের’ ঘটনায় ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তাও রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে। আদালত বলেছেন, রুলের শুনানি না হওয়া পর্যন্ত টেলিভিশন ও রেডিওতে ‘বিকৃত বাংলা উচ্চারণে’ অনুষ্ঠান প্রচারে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম একটি জাতীয় দৈনিকে ‘ভাষা দূষণ নদী দূষণের মতোই বিধ্বংসী’ শীর্ষক একটি নিবদ্ধ লেখেন। ওই নিবন্ধটি আদালতের নজরে এলে আদালত ওই আদেশ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব রকিব উদ্দিন আহমেদ ওই নিবন্ধটি জনস্বার্থে আদালতের নজরে আনেন। তিনি আদালতকে বলেন, বাংলা ভাষার অবক্ষয় রোধে আদালতের নির্দেশনা প্রয়োজন। তা না হলে বিকৃত উচ্চরণে বাংলা ভাষায় অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ হবে না।

প্রতি একুশে ফেব্রয়ারি ছাড়া বছরের বাকি দিনগুলোতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পবিত্রতা রক্ষা করা হয় না- এই অভিযোগ এনে ২০১০ সালের ফেব্রয়ারিতে হাইকোর্টে রিট করে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ। সংগঠনের তরফে আদালতে বলা হয়, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার একটি ঐতিহাসিক স্থান, ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে এই স্থাপনা গড়া হলেও এখন এর ব্যবস্থাপনা ভালো নয়। এখন সেখানে মাদকাসক্তদের আড্ডা, অসামাজিক কার্যকলাপ হয়। অর্থাৎ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে শহীদ মিনারের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ আনা হয় রিট আবেদনে।

২০১০ সালের ফেব্রয়ারির ৯ তারিখে বিষয়টি আমলে নেন হাইকোর্ট। শহীদ মিনারের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, সে বিষয়ে রুলও ইস্যু করেন বিচারপতি মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও বিচারপতি নাঈমা হায়দারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বেঞ্চ। শুনানি শেষে রায় হয় ২৫ আগস্ট। রায়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে, তাদের স্মৃতি রক্ষায় শহীদ মিনার গড়ার নির্দেশ দেয়া হয়। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতেও নির্দেশ দেয়া হয়। অবশ্য কিছু কিছু পদক্ষেপ আদালতের তরফে পরিষ্কার করে বলে দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে সেখানে পাহারার ব্যবস্থা করা, যারা ভবঘুরে বা মাদকাসক্তদের আনাগোনা ঠেকাবে।

শহীদ মিনারের মূল বেদিতে সভা-সমাবেশ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, আমরণ অনশন, অবস্থান ধর্মঘট বা এই জাতীয় কর্মকান্ডও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। রক্ত দিয়ে মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার অর্জনের স্মারক, শহীদ মিনারের মূল বেদির পাদদেশে অবশ্য সভা, সমাবেশ, শোভাযাত্রা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড করার অনুমতি দেন আদালত। এর ফলে শহীদ মিনারের মূল বেদির ব্যবহার একটি আইনি কাঠামোর আওতায় চলে আসে। জুতা খুলে শহীদ মিনারের মূল বেদিতে যাওয়ার একটি প্রথা সবাই মেনে চলেন। মূল বেদির বাইরে সভা-সমাবেশ করলে দর্শক জমায়েতও নিশ্চয়ই মূল বেদিতে হতে পারবে না।

শুধু শহীদ মিনার নয়, রায়ে নির্দেশনা এসেছে ভাষা শহীদ ও ভাষা সংগ্রামীদের সম্পর্কেও। ভাষা আন্দোলনে শহীদ, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের, মরণোত্তর পদক, আর জীবিত ভাষা সংগ্রামীদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে রায়ে। সরকারকে বলা হয়েছে তাদের যথাযথ সুযোগ-সুবিধা দেয়ার।

মামলার বিবাদী করা হয় প্রধামন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র, পিডব্লিউডির প্রধান প্রকৌশলী ও চিফ আর্কিটেক্টকে।

প্রকৃত ভাষা আন্দোলনকারীদের একটি তালিকা করে ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যেই তা গেজেট আকারে প্রকাশেরও নির্দেশ দেয়া হয় রায়ে। আর এই তালিকা করতে একটি কমিটি গঠনেরও নির্দেশ দেয়া হয় সরকারকে। সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তাদের আমন্ত্রণ জানানোর নির্দেশও রয়েছে আদালতের তরফে। কিন্তু কোনো কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। তারপর হাইকোর্টের নতুন নির্দেশনা কতটুকু বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে খোদ সুধীজনদের মধ্যে কিছু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে অবশ্য একটি প্রবাদ উল্লেখ করা যায়, যে দেশে গুণীর কদর হয় না, সেদেশে গুণী জন্মায় না।

লেখক: (সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও অ্যাডভোকেট)

E-mail: seraj.pramanik@gmail.com

 

editor

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।