বই হোক নিত্য সঙ্গী

বই হোক নিত্য সঙ্গী

॥॥ বিশ্ব গ্রন্থ ও গ্রন্থস্বত্ব দিবসের ভাবনা ॥॥

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ: বই সুস্থ্য চিন্তার প্রতীক। বই অন্ধকারে আলোর প্রদ্বীপ। সুতরাং শিক্ষিত সমাজ ব্যবস্থার ভীত শক্ত করতে হলে সর্বগ্রে সকলের মনে বই সম্পর্কে একটি সুষ্ঠু ধারণা সৃষ্টি করতে হবে। কেননা, শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। প্রকৃত শিক্ষা ব্যতীত কোন জাতির সার্বিক উন্নতি আদৌ সম্ভব নয়। আর সে কারণেই সবার মধ্যে বইয়ের প্রতি ভালোবাসা ও আগ্রহ জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯৯৫ সালে ইউনেস্কো ২৩ এপ্রিল কে ‘বিশ্ব গ্রন্থ ও গ্রন্থস্বত্ব দিবস’ ঘোষণা করে। এই দিনটিকে গ্রন্থ দিবস হিসেবে নির্বাচনের অন্তরালের মূল কারণ হচ্ছে এ দিনেই জন্ম গ্রহণ করেছিলেন বিশ্ব সাহিত্যের দুই মহান ব্যক্তি সেক্সপীয়ার ও সারভান্তেস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে সংগতি রেখে বাংলাদেশেও যথাযথ মর্যাদা ও গুরুত্বের সাথে দিবসটি পালিত হয়।

কবি সাহিত্যিকদের ভাষায় ’রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্ত-যৌবনা – যদি তেমন বই হয়।’ আসলেই বই অনন্ত যৌবনা। বই পুরাতন হতে পারে না। বইকে পুরাতন করার জন্য দায়ীতো আমরা। আমরা বইকে যেখানে সেখানে না রেখে যদি এমন স্থানে রাখি যেখানে বইয়ের সঠিক ব্যবহার হবে। বইয়ের মূল উদ্দেশ্য সফল হবে। মানুষের বই এবং বই কেন্দ্রীক অন্যান্য বিষয়ে চর্চা বহু আগে থেকে চলে এলেও আন্তর্জাতিক ফোরামে এ নিয়ে চিন্তা ভাবনা একেবারেই নতুন। জাতিসংঘ যাত্রার পর থেকে বিশ্বে বিরাজমান যুদ্ধ, হানাহানি, অস্ত্রের প্রতিযোগিতা, শক্তির মহড়া, মানবাধিকার লংঘন, নির্যাতন, এসব-ই ছিলো আলোচনা ও ভাবনার ক্ষেত্র। উন্নয়নের কর্মসূচির পথে বিশ্ববাসীর যাত্রার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও মনোযোগ বি¯তৃত হয় ক্রমশ। গ্রন্থ দিবস এবং এর উদযাপন বিশ্বসভার সংস্কৃতির ধারণার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির-ই প্রতিফলন। বই মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু। একটি উত্তম গ্রন্থ মানুষের পরম আশ্রয়। একটা সময় ছিলো যখন অবসর সময় মানেই বইয়ের সাথে সক্ষ্যতা। সুন্দর উপহার মানেই বই। বইয়ের সংগ্রহ থাকা মানেই সমাজের সম্মানীত ব্যক্তি। আর যারা লেখক প্রকাশক ছিলেন তাদের প্রতিও ছিলো সাধারণ মানুষের অশেষ শ্রদ্ধা। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে এসব অনেকাংশে-ই এখন বাধাগ্রস্থ। কম্পিউটার ও তথ্য প্রযুক্তির বিশাল সমারোহ অতিক্রম করে যাচ্ছে বইয়ের আবেদনকে। এখন আর অবসর সময় মানেই বই নয়। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ডামাডোলে গ্রন্থের ভবিষ্যৎ কি হবে কিংবা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কতটা জ্ঞানী হয়ে ওঠতে পারবে সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মহলের সংশয় থেকেই যাচ্ছে। তবুও একটি বিশেষ শ্রেণীর কাছে বইয়ের প্রতি মানুষের ভালোবাসা চিরন্তন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আলোকে উন্নত হচ্ছে বই প্রকাশনা, ব্যবস্থাপণা ও বিপণন। ক্ষেত্র বিশেষ বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। বইয়ের চাহিদাও উত্তরোত্তর বাড়ছে। বিষয়, প্রকাশনা শৈলী ও প্রচার বৈচিত্রে বই যেনো আরো আর্কষনীয় ও সমাদৃত হয় সেই লক্ষ্যে নিয়ে কর্ম পরিকল্পনা চলছে। ভালো বই সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ, প্রকাশ ইত্যাদিতে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় যে গতি, প্রাণ ও চকম সৃষ্টি হচ্ছে তা গ্রন্থ জগৎ কে প্রতিনিয়ত দারুণ আকর্ষণীয় করে তুলছে। প্রযুক্তির বিস্তৃতির সাথে সাথে সমান্তরালে বাড়ছে পাঠক চাহিদা, পাঠক বৈচিত্র্য, রূচি ও পাঠ হৃদয়ঙ্গম করার তীক্ষèতা। সুতরাং আধুনিকতা এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রসার গ্রন্থজগৎকে বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যহত করলেও বৃহৎ ক্ষেত্রে করছে গতিশীল।

বাংলাদেশে প্রথমবার দিবসটি পালিত হয় ২০০০ সালে। বাংলাদেশ সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ আয়োজন করে র‌্যালী ও বিবিধ আলোচনা সভা। পরিষদ এই দিবসে ভবিষ্যৎ বইমেলা, পত্র-পত্রিকায় গ্রন্থ ও গ্রন্থপাঠ প্রভৃতির আয়োজন করা হবে মর্মে আশা প্রকাশ করে। যদিও তাদের সেই আশা অনেকাংশে-ই উদ্যোগের অভাবে বুমেরাং হয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের কোন কোন সংস্থা বিশেষ করে ইউনেস্কো বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালনে উদ্ধুদ্ধ করছে। বৃটিশ সরকারের উদ্যোগে ইংল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের প্রতিটি স্কুলের প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীকে আর্ন্তজাতিক বই দিবস উপলক্ষে একটি করে বই উপহার দেয়ার প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। ৫ জানুয়ারী থেকে ইংল্যান্ডে সমস্ত স্কুল প্রধান শিক্ষকের কাছে আর্ন্তজাতিক গ্রন্থ দিবসের বাণী সম্বলীত পোষ্টার ও লিফলেট পৌছানো হয়। বাংলাদেশে বইয়ের প্রসার সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য সরকারীভাবে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বই ক্রয় করা হয় এবং স্কুল-কলেজে বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়। ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠ মনস্ক করে তোলার জন্য বেসরকারী পর্যায়েও বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়। এতো সবের পরও বাংলাদেশে এখনো বিপুল পাঠাভ্যাস গড়ে ওঠেনি। পাঠাভ্যাসের আলো বিতরণের জন্য পাঠাগার, প্রতিষ্ঠান, সংগঠনের সংখ্যা নিতান্ত-ই নগন্য!

বই জ্ঞানের ভান্ডার। বই মানুষের সব সময়ের বন্ধু, নিত্য সঙ্গী। ভালো বই পাঠাভ্যাসের ফলে একজন মানুষের সৃষ্টিশীল চিন্তা-চেতনা প্রসরিত হতে পারে। বই রাখতে পারে সুস্থ্য এবং সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা। মোট কথা, বইয়ের বিকল্প হতে পারে শুধু-ই বই।  বিশ্ব গ্রন্থ দিবসের প্রেরণা ও অঙ্গীকার হতে হবে, বিশ্বের সকল মানুষ গ্রন্থপ্রিয় মানুষে পরিণত হোক…! সেটাই হবে আজকের দিনের প্রত্যাশা।।

[শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ: প্রধান সম্পাদক,এসবিডি নিউজ24 ডট কম।]
jsb.shuvo@gmail.com

প্রধান সম্পাদক