অন্তর্গত…

অন্তর্গত…
ছবি: সুমন্ত আসলাম।

সুমন্ত আসলাম: হরিপদ কাকা জুতো সেলাই করতেন। মানুষজন ডাকতেন হরিয়া। আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে ফুটপাতে বসতেন তিনি। সারাদিন কাজ করার পর জিনিসপত্রগুলো রেখে যেতেন আমাদের ওখানে, তারপর বাসায় ফিরতেন। তার স্ত্রী কাঞ্চু কাকি দুপরের খাবার নিয়ে আসতেন তার জন্য।

আমাদের গ্রাম থেকে স্কুলটা ছিল প্রায় দু মাইল দূরে। হেঁটে যেতাম, হেঁটে ফিরতাম। মাঝেই মুচিপাড়া, হরিপদ কাকার বাড়ি। ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন। খুব পানি পিপাসা পেল একদিন। আমাকে দেখেই কাঞ্চু কাকি দৌড়ে এসে হাত টেনে ধরে বললেন, ‘বাবা, তিয়াস পাইছে?’ মায়ের মতো এক গ্লাস পানি দিলেন তিনি আমাকে, সোনার মতো ঝকঝকে কাঁসার গ্লাস, সঙ্গে চিনির দুটো বাতাসা। তুপ্তি ভরে খেয়েছিলাম সেদিন।

আমাদের বাড়িতে একজন জায়গীর থাকতেন। পড়াতেনও আমাদের। কিছুটা হুজুর গোছের। কথাটা শুনে হা হা করে উঠলেন তিনি, ‘এটা কি করিচ্ছু তুমি! মুচির বাড়িত পানি খাইছো!’ আমার আদিঅন্ত ধর্মপ্রাণ বাবা তার হাতে তববিহটা দুলিয়ে বললেন, ‘সমস্যা নাই। কাঞ্চুরাও তো মানুষ!’

প্রায় আড়াই যুগ আগের কথা মনে পড়ল আজ। মিরপুর-১২ নম্বরের মেইন রোডের পাশে গরুর দুধের চা বিক্রি হয় একটা দোকানে। আজ সকালে ওখানে গিয়ে দ্রুত চা চাইতেই দোকানদার বলল, ‘একটু ওয়েট করেন, কাপ খালি নাই।’ সিটি কর্পোরেশনের রাস্তার ঝাড়ৃ দেওয়া এক মহিলা তার হাতের চায়ের কাপটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমি মুখ দেই নাই বাপজান, আপনি খান।’

হুবুহু মায়ের ছায়া ভেসে উঠল আমার চোখে। মুচি কিংবা রাস্তার ঝাড়–দার—আমার মায়ের মতো দুটো হাত-পা, আমাদের মায়ের মতোই বুক ভরা মাতৃত্ব, অপরিমেয় ভালোবাসাও।

মায়ের বাড়িয়ে দেওয়া চায়ের মতোই চুমক দিলাম তৃপ্তি ভরে। চোখ বুজে আসে আমার, মন ভেসে যায় অন্তর্গত জলে।

[সুমন্ত আসলাম: সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক সমকাল]

অতিথি লেখক