ঈদ: ঐক্যের বন্ধনে, সুশোভিত অলংকরণে

ঈদ: ঐক্যের বন্ধনে, সুশোভিত অলংকরণে

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ: ঈদ। খুশির ঈদ। ঈদের আনন্দ সবার ঘরে ঘরে। ধনী-গরিব, উচু-নিচু সবাই আজ এক কাতারে। কি আনন্দ! ইসলামের সুশোভিত সুন্দর শুধু মুসলমানকেই আকৃষ্ট করেনি। সমগ্র বিশ্ব মানবতাকে করেছে অলংকৃত। পবিত্র ঈদুল আজহা। মুসলিম মিল্লাতের পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ:)-এর ত্যাগের স্মৃতিবিজড়িত এই ঈদ। সকালে ঈদের নামাজ শেষে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করবেন সামর্থ্যবান মুসলমানরা। মূলত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রয়োজনে নিজের প্রিয় বস্তুকে কোরবানি দেয়াই এই ঈদের শিক্ষা।


জানা যায়, প্রায় সাড়ে ৭ হাজার বছর আগে মুসলিম জাতির আদি পিতা হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তান হাবিল ও কাবিলের মধ্যে বিবাহকে কেন্দ্র করে বিবাদ দেখা দিলে হযরত আদম (আঃ) তাদেরকে কোরবানী করার আদেশ দেন। তখন থেকেই কোরবানীর প্রচলন শুরু হয়। তবে সে সময় কোরবানীর নিয়ম ছিল ভিন্ন। ভেড়া, দুম্বা, শস্য বা গম ইত্যাদি কোরবানীর জন্য পেশ করা হতো। যার কোরবানী কবুল হতো আল্লাহপাকের হুকুমে আকাশ থেকে অগ্নি এসে তা ভস্মীভূত করে দিত। যারটা কবুল হতো না তারটা এমনি পড়ে থাকতো।


মূলত, কুরবানী আরবী শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে অতিশয় নিকটবর্তী হওয়া। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় কোরবানী বলা হয় ঐ নির্দিষ্ট জন্তুকে যা একমাত্র আল্লাহপাকের নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে নির্দিষ্ট সময়ে একমাত্র আল্লাহর নামে জবেহ করা হয়। কোরবানীর প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে কোরবানী আল্লাহর নবী হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর অতুলনীয় ত্যাগের স্মৃতি বহন করে। কোরবানীর দ্বারা মুসলমানগণ ঘোষণা করে যে,তাদের কাছে আপন জানমাল অপেক্ষা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মূল্য অনেক বেশি। কোরবানীর মাধ্যমে ত্যাগ ও উৎসর্গের দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করাই উদ্দেশ্য। এর দ্বারা আল্লাহপাক মানুষের আন্তরিকতা যাচাই করেন।


পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে: “কখনই আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না এগুলোর গোশত ও রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া”(সূরা হজ্জ আয়াত-৩৭)। কে কত টাকা খরচ করে পশু ক্রয় করেছে,কার পশু কত মোটা,কত সুন্দর,আল্লাহপাক তা দেখেন না বরং তিনি দেখতে চান কার অন্তরে কতটুকু তাকওয়া বা পরহেজগারী আছে। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত, দীর্ঘ হাদীসে প্রিয় নবী (সাঃ) ঘোষণা করেছেন,“নিশ্চয়ই আল্লাহপাক তোমাদের শরীর ও চেহারা-সুরতের দিকে লক্ষ্য করেন না, কিন্তু তিনি লক্ষ্য করেন তোমাদের অন্তর এবং আমলের দিকে।” (মুসলিম শরীফ)।


ইতিহাস থেকে জানা যায়, আল্লাহতায়ালা মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে অনেকবার পরীক্ষা করেছেন। সকল পরীক্ষায় তিনি অত্যন্ত সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন। একরাতে তিনি স্বপ্নে দেখলেন, আল্লাহপাক তাকে ইঙ্গিত করেছেন প্রাণধিক পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে কোরবানী করতে। বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র সন্তান হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর অপেক্ষা অধিকতর প্রিয় আর কি হতে পারে। তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন যে, হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে কোরবানী করবেন।


তখন তিনি হযরত ইসমাঈল (আঃ) বললেন, যা পবিত্র কোরআনে এভাবে বর্ণিত হয়েছে: “হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে,তোমাকে আমি জবাই করছি। এখন তোমার অভিমত কি?” সে হযরত ইসমাঈল (আঃ) বলল,“হে পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তাই করুন। আল্লাহ চাহেতো আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।” (সূরা সফফাত আয়াত-১০২)। ছেলের সাহসিকতাপূর্ণ জবাব পেয়ে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) অত্যন্ত খুশি হলেন। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ছেলের গলায় ছুরি চালান। তখন হযরত জিব্রাইল (আঃ) আল্লাহর নির্দেশে বেহেশত হতে একটা দুম্বা নিয়ে রওয়ানা হলেন।

..
তার মনে সংশয় ছিল পৃথিবীতে পদার্পণের পূর্বেই হযরত ইব্রাহীম (আঃ) যবেহ কাজ সম্পূর্ণ করে ফেলবেন। তাই জিবরাইল (আঃ) আকাশ হতে উচ্চৈস্বরে ধ্বনি দিতে থাকেন “আল্লাহু আকবার”। আওয়াজ শুনে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠলেন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার”। পিতার মুখে তাওহীদের বাণী শুনতে পেয়ে হযরত ইসমাঈল (আঃ) বলে উঠলেন আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিলহামদ”।


আল্লাহর প্রিয় দুই নবী এবং হযরত জিবরাইল (আঃ)-এর কালামগুলো আল্লাহর দরবারে এতই পছন্দনীয় হলো যে, কিয়ামত পর্যন্ত এই কথাগুলো ৯ই জিলহজ্ব ফজর থেকে আসর পর্যন্ত বিশেষ করে ঈদুল আযহার দিনে বিশ্ব মুসলিমের কণ্ঠে উচ্চারিত হতে থাকবে। আল্লাহপাকের অসীম কুদরতে হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর পরিবর্তে কোরবানী হয়ে গেল একটি বেহেস্তী দুম্বা। কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ)।


এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ পবিত্র কালামে ঘোষণা করেন, “তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইব্রাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা একটা সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি ইসমাঈল (আঃ)-এর পরিবর্তে দিলাম জবেহ করার জন্য এক মহান জন্তু।” (সূরা সাফফাত আয়াত-১০৪-১০৭)। বর্ণিত আছে যে, হযরত ইব্রাহীম (আঃ) উপরোক্ত গায়েবী আওয়াজ শুনে হযরত জিবরাইল (আঃ)কে একটি বেহেস্তী দুম্বাসহ দেখতে পান।


এ জান্নাতী দুম্বা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে দেয়া হলে তিনি আল্লাহর নির্দেশে পুত্রের পরিবর্তে সেটি কোরবানী করলেন। আর তখন থেকেই শুরু হলো কোরবানীর মহান বিস্ময়কর ইতিহাস। যা অন্ততকাল ধরে সুন্নতে ইব্রাহীম হিসেবে বিশ্বের সকল মুসলমানের কাছে আজও স্মরণীয় হয়ে আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে।


কোরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কোরবানীর তাৎপর্য ও ফজিলত সম্পর্কে বহু হাদীস পাওয়া যায়। হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা কতিপয় সাহাবী প্রিয় নবী (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল!, কোরবানী কি? প্রিয় নবী (সাঃ) বললেন, তোমাদের (জাতির) পিতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর সুন্নত। পুনরায় প্রশ্ন করা হলো, এতে আমাদের জন্য কি আছে? রাসূলে পাক (সাঃ) বললেন, কোরবানী গরু ও বকরীর প্রতিটি পশমে নেকী রয়েছে। তখন সাহাবায়ে কেরাম আবার জিজ্ঞেস করলেন,তাহলে ভেড়া ও দুম্বার ব্যাপারে আপনার অভিমত কি? তিনি উত্তরে বললেন,ভেড়া ও দুম্বার পশমেও ছওয়াব আছে। (আহমাদ, ইবনে মাযাহ, মিশকাত-১২৯)।


কেয়ামতের দিন কোরবানীর পশু তার শিং,পশম ও খুরসহ উপস্থিত হবে এবং কোরবানীর রক্ত জমিনে পড়ার পূর্বেই তা আল্লাহর নিকট কবুল হয়ে যায়। অতএব,তোমরা এ পুরস্কারে আন্তরিকভাবে খুশী হও। (তিরমিযী, ইবনে মাযাহ্‌, মিশকাত-পৃ-১২৮)। কোরবানী করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি লাভের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করা।


বস্তুত, হযরত ইব্রাহীম (আঃ) মহান আল্লাহপাকের প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের যে অনুপম আদর্শ স্থাপন করেছেন তা যেমন অতুলনীয় ঠিক তেমনিভাবে চির অনুস্মরণীয়। এ দিনটি একদিকে যেমন একটি নির্মল আনন্দঘন, অপরদিকে তা একে অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধ জাগরুক,আপন মহিমায় ভাস্বর।


এ দু‘টি ধারা মিলেই এটি পবিত্ররূপ লাভ করেছে রাসূলূল্লাহ (সা.)  মদীনায় হিজরাতের পর মদীনাবাসিকে উত্সব পালনের নির্দেশনা প্রদানকালে। এর পর থেকেই এ দু‘টি উত্সব অদ্যাবধি মুসলিম দেশ ও সমাজে পালিত হয়ে আসছে। এ দিনটিকে ঘিরে আচরিত আচরণের ইতিহাস সুপ্রাচীন, ঐতিহ্যমণ্ডিত ও মহিমান্বিত; অনাগতকালের সমগ্র মানবজাতির জন্য তা শিক্ষাপ্রদ ও কল্যাণকর।


মুসলিম উম্মাহর মাঝে ঐক্য,সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টির নিয়ামক। কিন্তু বাস্তব অবস্থা মুসলিম উম্মাহ আজ শতধাবিভক্ত। এ দু‘টি উত্সব প্রতি বছর আসে এবং চলে যায়। কথা ছিল এ থেকে তারা ত্যাগ ও কুরবাণীর মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হবে, মানবতার কল্যাণ কাজে নিজেদেরকে ব্যাপৃত করবে, পরস্পর ঐক্য ও সংহতির পথে সুদৃঢ় হবে। বাস্তব অবস্থা কী তা আমরা সকলেই অবহিত। আমরা অর্থে কেনা বা পালিত পশু জবেহ করে কুরবানী দিতে শিখেছি; কিন্তু মনের পশুটিকে জীবনে একটি বারও কুরবানী দিতে কী শিখেছি?


ঈদ-উল-আযহা মূলত: ধর্মীয় উৎসব হলেও বাহ্যিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানের দিক থেকে এটি প্রায় ঈদুল ফিতরের অনুরূপ। ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল এই দিনেও থাকে আনন্দ উৎসব। সুখ,সৌহার্দ্য আর আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে এ উৎসব। সব ভেদাভেদ ভুলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে মিলিত হওয়ার দিন। পবিত্র ঈদ-উল-আযহার আনন্দ অমলিন হোক। পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ,অহংকার ভুলে খুশিমনে ভ্রাতৃত্বের বন্ধ সুদৃঢ় করেন।


ঈদ-উল-আযহার শিক্ষা হলো কোরবানীর মাধ্যমে নিজের পশুত্বকে জবাই করা। আল্লাহ রাসুলের নামে প্রিয় জিনিসকে কোরবানী দেয়া। মনের সমস্ত কালিমা দূর করা। এখন ঈদের আমেজ। সাজ সাজ রব সর্বত্রই। ঈদে নানা রকম খাওয়া-দাওয়া, বেড়ানোর আনন্দ অফুরান। এ আনন্দের অংশীদার সকলেই। আনন্দময় হোক আমাদের ঈদ উৎসব। হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি বিভেদ ভুলে আমরা সুন্দর মনে এক হয়ে মিলিত হই ঐক্যের বন্ধনে। ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল ঈদ-উল-আযহা উপভোগ্য হয়ে উঠুক। সবাইকে ঈদ মোবারক।।


শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ: সিনিয়র সাংবাদিক।।

jsb.shuvo@gmail.com

প্রধান সম্পাদক