একটি চিঠি এবং অসংখ্য প্রশ্ন…

একটি চিঠি এবং অসংখ্য প্রশ্ন…
প্রিয় জেসিকা ,

আমার এই চিঠি পেয়ে চমকে উঠো না । অনন্যোপায় হয়ে আমি তোমাকে লিখতে বসলাম । তোমরা তো পৃথিবীর সাথে আমার সব লেন দেন জোর করে চুকিয়ে দিয়েছ কিন্তু আমি বড় অশান্ত , কষ্ট পাচ্ছি ।

এই সমাজ কে আমি খুব ভয় পেতাম । তাই নিজেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলাম । হিজাব পড়তাম বোরখা পড়তাম যাতে পথে ঘাটে কোথাও আমাকে নেকাব বিহীন চালচলনের জন্য হেনস্তার স্বীকার হতে না হয় । আমাকে কে বাঁচাবে বলো আমার ভাই নেই, বাবার বয়স হয়ে গেছে চাচা মামার জোর নেই তাই নিজেকে নিজেই আত্মরক্ষা করে চলতাম । আমি তো সব আইন কানুন মেনেছি তারপরেও কেন আমার এই অসম্মানিত পরিনতি হল বলতে পারো ? কেন আমাকে কেউ রক্ষা করলো না ?

তুমি তো আইনের লোক কতো মানুষের জন্য লড়াই করো ,সে দিন ভারতের দামিনীর জন্য কলম ধরেছিলে , আমার খবরটা কি তোমার একবারও চোখে পরে নি ?ব্রাক হাজার হাজার নারীর কর্ম সংস্থান করেছে বলে তারা আজ পৃথিবীর একটা নাম করা এন জি ও । লক্ষ লক্ষ নারীকে আলোর পথ দেখাচ্ছে বলে দাবী করে দেশে বিদেশে , হাততালিরও কোন অভাব নেই কিন্তু আমার যে জীবনের আলোটা অকালে নিভিয়ে দিলো তার কি কোন বিচার হবে না ?

তাদের কি আইনত দায়িত্ব ছিলো না আমার কর্মক্ষেত্রে আমার মান সম্ভ্রম ও জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া ? তোমাদের আইন কি বলে জেসিকা ?

আমি সাজিয়া আরেফিন ইভা । পেশায় ডাক্তার ছিলাম । সিলেট মেডিকেল কলেজ থেকে আমি ২০০৭ সালে এম বি বি এস ডিগ্রী করি । বাবা বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিসে একটা সামান্য চাকরি করেন । মা গৃহিণী । আমরা দুই বোন । কোন ভাই নেই যে আমার জন্য লড়বে । বাবা অনেক কষ্ট করে সামান্য বেতনের টাকায় আমাকে লেখাপড়া করিয়েছিলেন । হয়তো ভেবেছিলেন নাই বা হোল ছেলে আমি মেয়ে হয়ে লেখাপড়া করে বাবার পাশে দাঁড়াবো । বিশ্বাস করো আমারও ইচ্ছে ছিলো তাই , এম বি বি এস পাশ করার পর এই জন্য আমি এফ সি পি এস ( প্রথম পর্ব ) এক চান্সে পাশ করি । তার পর আসে দ্বিতীয় পর্ব । সারাদিন লেখাপড়া করতে হয় । নিজের বুড়ো বাবার ওপর আর টাকার জন্য চাপ দিতে লজ্জা লাগে কষ্ট হয় । আমার ছোট বোনটারও তো পড়ার খরচ আছে । তাই ব্র্যাক এর দক্ষিন খানের একটা ক্লিনিকে আমি পার্ট টাইম চাকরী নেই । সারাদিন পড়ালেখার চাপ রাতে চাকরী জীবন ধারনের জন্য ।

সে দিন ক্লিনিকে আমি ডিউটিতে যাই রাত আটটায় । ঠিক সাড়ে নয়টার সময় আমি একটা নরমাল ডেলিভারি ( বাচ্চা প্রসব ) করানোর জন্য লেবার রুমে যাই । আমার কাজ শেষ হয় আনুমানিক রাত এগারোটার দিকে । সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত আমি , এশার নামাজ বাকী । নামাজ শেষে নামাজের কাপড় বদলিয়ে খেয়ে নেবো ভাবছিলাম এমন সময় আমার দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দ শুনতে পেলাম । তখন রাত ১২ টা । এক দুই তিন ……
.
: কে
: আমি ফয়সল ম্যাডাম , হাসপাতালের কেয়ার টেকার ।
: কি চান ?
: একটু আসুন । রোগী খারাপ
: কোন রোগী?
: একটু আগে যার ডেলিভারি করিয়েছেন,তিনি ।
: আসছি

নামাজের কাপড় না খুলে ভাত না খেয়ে সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে অ্যাপ্রোন গায়ে চাপালাম । দরজা খুললাম ।
নেমে এলো কালো ভয়াল হাত , হায়েনার হাত আমার মুখ চেপে ধরলো ।
আমি চিৎকার করতে চাইলাম । আমার জীবনের শেষ মুহুর্ত । একদম শেষ..

আমি মেডিক্যাল সাইন্সের মানুষ , আমি জানি আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে , হাত পা ছুড়ছি আমি প্রাণপণে , না আর পারছিনা ………… আমার শরীর নিথর হচ্ছি , আমার জিভ বের হয়ে আসছে , নীল হয়ে যাচ্ছি আমি ….. আমি শ্বাস নিতে আর পারছি না …… আর পারলাম না ।

নভেম্বরের ৩০ তারিখ রাত ১২টা ২০ মিনিট তখন ।

জীবনটা রক্ষা করতে পারলাম না । একটা মানুষ নামের পশুর হাতে আমাকে প্রান দিতে হোল । একটা মেয়েকে জীবন থেকে এত দ্রুত বিদায় বলতে হলো । কেন বলতে পারো ?

আমি মাত্র তো জীবন শুরু করেছিলাম ।

জেসিকা,আমি তোমাদের আইন পড়িনি তাই জানি না । আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো ।

এক ।
ব্র্যাক দক্ষিন খান ক্লিনিকের কি কোন দায়িত্ব ছিল না আমার জীবন সম্ভ্রমের নিরাপত্তা দেবার ? এই ব্যপারে আইন আমার পরিবার কে কি সাহায্য করতে পারে ?
দুই ।
আমার জীবনের মূল্য কতো ? কে পরিশোধ করবে এই মূল্য আমার পরিবারকে ? কারণ আমারই তো আমার বুড়ো বাবা মা বোন কে দেখাশোনা করার কথা ছিল ।
তিন ।
আমি সিলেট মেডিকেল কলেজের ছাত্রী ছিলাম । আমার মৃত্যুর পর তারা পালন করলো সিলেট মেডিকেল কলেজের ৫০ বৎসর পূর্তি-উৎসব। আমার কি কোন দাবী নাই কলেজের ওপর ? তারা কি আমার এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইতে পারত না সরকারের কাছে ? ক্ষতিপূরণ চাইতে পারতো না ব্র্যাক এর কাছে ?
চার ।
আমি তো তোমার মতো একজন নারী , একবারও কি আমার জন্য তোমরা দুই কলম লিখতে পারতে না ? আজ আমার এই করুন পরিনতি কাল তোমার হবে না কে বলতে পারে ? আমি নিজেও কি জানতাম আমার পরিণতির কথা ?
পাঁচ ।
এতো গুলো নারী সংগঠন,রাজনৈতিক দল আছে কতো দাবী নিয়ে তারা রাস্তায় নামে । হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে সরব নীরব মিছিল করে , কই আমার বেলায় তো কেউ কিছু বলল না ?
ছয় ।
আমাদের সংগঠন বি এম এ যেখানে আমি ডাক্তার হওয়ার পর থেকে চাঁদা দিয়ে আসছি তাদের কি কোন দায়িত্ব নেই ?

জেসিকা তোমার একটা লেখা পড়ে একদিন হেসেছিলাম , আজ মনে হয় তোমার কথাই ঠিক

রাতের কুয়াশার মননে বলি তুমি কি একটু বলে আসবে ভাই ?
যারা লাশ হয়ে যায়, এ দেশে তাদের আর চাইবার কিছু নাই ।

তোমারা আমার বাবার দিকে একটু তাকাও !
ইতি :
সাজিয়া আরেফিন ইভা

( এটা একজন নারী হয়ে আমার মানবিক আবেদন । আপনারা যদি আপনাদের ওয়াল থেকে শেয়ার করেন কৃতজ্ঞ থাকবো , ধন্যবাদ )
বিঃদ্রঃ লেখাটি আইনজীবি জেসিকা ইরফানের ওয়াল থেকে সংগৃহীত।

এসবিডি নিউজ ডেস্ক